৩ লাখে শিশুর জীবনের দাম! ফতুল্লায় লাশের ওপর রাজনীতির ‘মীমাংসা’

পাঁচ বছরের ফুটফুটে শিশু মুনতাসীর ইসলাম হামজা ওরফে ইয়াছিন। রাজপুত্রের মতো দেখতে ছেলেটির নিথর দেহ এখন নিথর পড়ে আছে। কিন্তু এই শোকের মাতমের মাঝেই পর্দার আড়ালে শুরু হয়েছে এক কুৎসিত দরকষাকষি। মাত্র ৩ লাখ টাকায় একটি প্রাণের মূল্য নির্ধারণ করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে। শুক্রবার সকালে ফতুল্লার দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকায় মিজানুর রহমানের নির্মাণাধীন ভবনে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই চলছিল পাইলিংয়ের কাজ। হঠাৎ একটি ভারী লোহার পাইপ ছিঁড়ে পড়ে শিশু ইয়াছিনের ওপর। ঘটনাস্থলেই পিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় তার। কিন্তু এই মৃত্যুতে ভবন মালিক বা ঠিকাদারের অনুশোচনার চেয়ে বেশি দেখা গেছে ‘বাঁচবার চেষ্টা’।

৩ লাখ টাকার ‘অফার’ ও মধ্যস্থতাকারী
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই আইনি ঝামেলা এড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে মালিকপক্ষ। আর এই কাজে ‘ঢাল’ হিসেবে আবির্ভূত হন জেলা তাঁতীদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল। স্থানীয় একটি মসজিদে বসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে তিনি নিহতের পরিবারকে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে মামলা না করার প্রস্তাব দেন।

নিহত ইয়াছিনের বাবা রুবেল মিয়া কুমিল্লা থেকে ফিরে এসে এই প্রস্তাব শুনে স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, “উজ্জ্বল ভাই আর ঠিকাদার মিলে আমারে ৩ লাখ টাকা দিতে চায়। আমি টাকা দিয়া কী করমু? আমার রাজপুত্রই তো নাই! আমি আমার পোলা হত্যার বিচার চাই।”

নেতার বক্তব্য ও ‘সংবাদ না করার’ অনুরোধ
এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী নেতা সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বলের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, তিনি ‘গরিব পরিবারটির উপকারের’ জন্য এই আলোচনা করেছেন। এক পর্যায়ে এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রতিবেদকের কাছে অনুরোধও জানান তিনি।

প্রশাসনের নীরবতা ও অবহেলা
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আব্দুল মান্নান স্পষ্ট জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন ভবনে বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ভবন মালিক ও ঠিকাদারের চরম অবহেলাই এই মৃত্যুর কারণ। তবে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে মীমাংসার বিষয়টি পুলিশের জানা নেই বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, পরিবার অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি শিশুর অকাল মৃত্যু কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা, নাকি ক্ষমতার দাপটে মানুষের জীবনের অবমূল্যায়ন? ৩ লাখ টাকা কি একটি বাবার বুক খালি হওয়ার যন্ত্রণা উপশম করতে পারবে? এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আইন কি তার নিজস্ব গতিতে চলবে, নাকি রাজনৈতিক নেতার ‘মসজিদ বৈঠক’-এই শেষ হয়ে যাবে ইয়াছিন হত্যার বিচার?

ফেসবুক থেকে

এই মাত্র পাওয়া

সর্বশেষঃ