নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় বিএনপি সভাপতির নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবির অভিযোগের জেরে একটি শিল্পকারখানায় হামলা, লুটপাট ও শ্রমিকদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর বর্তমানে পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে চলছে কারখানাটির কার্যক্রম। ঘটনার পর মামলা হলেও অভিযোগ উঠেছে—প্রভাবশালী এক নেতার নাম এজাহার থেকে বাদ দিতে চাপ দেয় পুলিশ।
চাঁদা না পেয়ে হামলা:ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় অবস্থিত ‘বি.এল.ও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ’ কারখানায়। কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান ওরফে হুমায়ুনের নাম ব্যবহার করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা-কর্মী। একাধিকবার বিষয়টি তিনি মাহফুজুর রহমানকে জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্তদের সঙ্গে ‘মীমাংসা’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে দাবি তার।
চাঁদা না দেওয়ায় মঙ্গলবার উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনের নেতৃত্বে একদল লোক কারখানায় হামলা চালায় বলে অভিযোগ। হামলায় কারখানার ম্যানেজারসহ কয়েকজন শ্রমিককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করা হয়। এ সময় নগদ অর্থ ও মালামালসহ প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদ লুট করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।

মামলায় নাম বাদ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর বুধবার মনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করে ৯ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
নাম উল্লেখ থাকা অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন—
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই কাজল আকন
তাঁদের ভাইয়ের ছেলে নিশাত আকন
মাহফুজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপি কর্মী মো. সাদিকুল
মো. ফাহিমসহ আরও কয়েকজন
তবে বাদীর দাবি, তিনি এজাহারে ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে মাহফুজুর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তার নাম বাদ না দিলে মামলা গ্রহণ করা হবে না বলে জানায়। পরে বাধ্য হয়ে তার নাম বাদ দিয়েই মামলা নথিভুক্ত করা হয়।
এই অভিযোগ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তদন্তে প্রভাব খাটানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে।রোববার সকালে সরেজমিনে কারখানায় গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। কারখানার ভেতরে-বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ ও মালামাল ঘটনার ভয়াবহতার সাক্ষ্য দিচ্ছিল। অপরিচিত কাউকে দেখলেই শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যায়। কারখানার সামনে পুলিশের উপস্থিতিও চোখে পড়ে।

কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ জানান,
হামলার পর দুই দিন কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এখন নারায়ণগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। আগে ৪০ জন শ্রমিক দিন-রাত কাজ করত। এখন মাত্র ১৫ জন শ্রমিক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, কারখানা এলাকার বাইরে শ্রমিকদের পেলে এখনও হামলাকারীরা হত্যা ও গুমের হুমকি দিচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রভাব নাকি ব্যক্তিগত দৌরাত্ম্য?
স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজির প্রবণতা নতুন নয়। তবে এ ঘটনায় সরাসরি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নাম জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মামলায় একজন প্রভাবশালী নেতার নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়—হামলার প্রকৃত নেপথ্যকারীরা চিহ্নিত হন কি না,শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় কি না,রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত সম্ভব হয় কি না,
পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু থাকলেও আতঙ্ক কাটেনি কারখানার শ্রমিকদের। শিল্পাঞ্চলে এমন ঘটনায় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।




