দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর অবশেষে বরখাস্ত ‘ব্রাজিল বাড়ির টুটুল’

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রহস্যজনক সম্পদ গঠনের অভিযোগের পর অবশেষে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপোর আলোচিত কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন টুটুলকে। তিনি স্থানীয়ভাবে ‘ব্রাজিল বাড়ির টুটুল’ নামে পরিচিত।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) কোম্পানির ডিজিএম (এইচআর) মোহাম্মদ হাসান ইমামের সই করা এক দাপ্তরিক আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত আদেশে উল্লেখ করা হয়, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

হাজিরা জালিয়াতি ও অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি কার্যত কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। মাসে মাত্র ২-১ দিন ডিপোতে এসে একসঙ্গে একাধিক দিনের স্বাক্ষর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই ছুটির আবেদন দিয়ে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা কোম্পানির নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরখাস্ত আদেশে বলা হয়, এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী গুরুতর অসদাচরণ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নজরদারি কোথায় ছিল?

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এতদিন কোম্পানির নজরদারি কোথায় ছিল?

একজন গেজার, যার দায়িত্ব মূলত তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করা—সেই পদে থেকেই কীভাবে অল্প সময়ে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান টুটুল? ক্যান্টিন বয় থেকে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকে পরিণত হওয়ার এই উত্থান কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে।

‘ব্রাজিল বাড়ি’ থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সময় নারায়ণগঞ্জে ব্রাজিল পতাকার রঙে নির্মিত ছয়তলা বাড়ি তৈরি করে আলোচনায় আসেন টুটুল। ‘ব্রাজিল বাড়ি’ নামে পরিচিত সেই ভবন দেখতে বিদেশি কূটনীতিক পর্যন্ত এসেছিলেন—যা তার অস্বাভাবিক সম্পদের প্রথম বড় প্রকাশ্য নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়।

প্রভাবের বিস্তার ও তেল গায়েবের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ফতুল্লা ডিপোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন। ডিপোর ভেতরে নিজস্ব অফিস, সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনকি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও তার প্রভাব বিস্তৃত ছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফতুল্লা ডিপো থেকে বিপুল পরিমাণ তেল গায়েব হওয়ার ঘটনায়ও তার নাম উঠে এসেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

দেরিতে হলেও পদক্ষেপ

সংশ্লিষ্টদের মতে, বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত অনেক দেরিতে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে চলা অভিযোগ, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং দায়িত্বে অবহেলার পর এই পদক্ষেপকে প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

এখন দেখার বিষয়—এই বরখাস্ত কেবল আনুষ্ঠানিকতা, নাকি ফতুল্লা ডিপো ঘিরে গড়ে ওঠা পুরো দুর্নীতির চক্র উন্মোচনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জনস্বার্থে একটি স্বচ্ছ, পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

ফেসবুক থেকে

এই মাত্র পাওয়া

সর্বশেষঃ